
সোহেল রানা (কুষ্টিয়া)
কুষ্টিয়া সদর ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন (৭৭) কুষ্টিয়া-৩ (সদর)। ভৌগলিক, বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক কারণে আসনটিকে জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন বলে বিবেচনা করা হয়। ৩১৬ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটারের এই আসন ১৩টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৩৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৭৫ জন আর পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ২৫৯ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারকে। জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ বক্তা মাওলানা আমির হামজাকে।
জামায়াতের একক প্রার্থী এবং বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার ছাড়াও সাবেক সাংসদ অধ্যক্ষ সোহরাব হোসেন মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছেন।
শেষ পযন্ত তিনি প্রার্থী থাকবেন কিনা প্রহ্যাহার করবেন এবিষয় অধ্যক্ষ সোহরাব হোসেন কোন মন্তব্য করেননি।
এদিকে
বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আহম্মদ আলী এবং খেলাফত মজলিস কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক, গণঅধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের নাম শোনা যাচ্ছে।
বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ।
একসময় বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল কুষ্টিয়ার এই আসনটি। ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত এখানকার সব কটি আসনই ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দুর্গে আঘাত হেনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার রশীদুজ্জামান দুদু। তার মৃত্যুর পর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে এখানকার এমপি ছিলেন মাহবুবউল আলম হানিফ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর লাপাত্তা হয়ে হন হানিফ।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ফাঁকা মাঠে অনেকটাই নির্ভার রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার।
এদিকে বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক সাবেক বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের সমর্থকরা।
এর আগে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়েও দলটির মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহম্মেদ রুমী এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দীনসহ বেশ কিছু সিনিয়র নেতাকে বাদ দিয়ে গঠন করা হয় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। এরপর থেকেই আহ্বায়ক কমিটি বাতিল করে পুনরায় কমিটি গঠন করার দাবিতে সোচ্চার হন দলটির একাংশের নেতা-কর্মীরা। তারা বর্তমান কমিটির নেতাদের বয়কট করে রাজপথে সভা-সমাবেশ করে আসছেন।
দলের অঙ্গসংগঠনের কমিটি নিয়েও বিতর্কের মুখে পড়ে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি। ফলে জেলা বিএনপির বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সর্বশেষ দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। কুষ্টিয়া-৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রার্থী বদলের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন সাবেক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দীনের সমর্থকরা। বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকারের পক্ষের কোনো সভা-সমাবেশ বা নির্বাচনি প্রচারে এখনো দেখা যায়নি বিএনপির ওই অংশের কিছু নেতা-কর্মীদের।
মাঠপর্যায়ের কর্মীরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত যদি এই বিভেদের সমাপ্তি না ঘটে এবং
মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার না হলে এই আসনে তাদের মাশুল দেওয়া লাগতে পারে। বিএনপির ঘাঁটি হলেও বিভক্তির কারণে দীর্ঘদিনের পর যে সুযোগ তাদের হাতে এসেছে, সেটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটি বিশাল রাজনৈতিক দল। এই দলে অনেক ত্যাগী নেতা আছেন, যারা দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু একাধিক ব্যক্তিকে তো আর মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব নয়। তাই ত্যাগী নেতাদের মধ্যে না পাওয়ার একটা কষ্ট থাকতে পারে, এটিই স্বাভাবিক। সেটিকে বিভেদ বা বিভক্তি বলা যায় না। আমরা সবাই শহিদ জিয়ার আদর্শের রাজনীতি করি। আমাদের আদর্শের প্রতীক ধানের শীষ। যারা বিএনপিকে ভালোবাসেন, বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে ভালোবাসেন, তারা ধানের শীষের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত।’
বিএনপির মধ্যে কিছুটা কোন্দল থাকলেও জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী ঘোষণা করে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। প্রথমদিকে জামায়াতে ইসলামী কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য অধ্যাপক ফরহাদ হুসাইনের নাম ঘোষণা করে। পরে তার জায়গায় বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ বক্তা মাওলানা আমির হামজাকে প্রার্থী করে জামায়াত। তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন কৌশলে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এবিষয়ে জানতে চাইলে আমির হামজা বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর মানুষ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছেন। আমি মনে করি, মানুষ আমাকে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে বিজয়ী করবেন। কারণ আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি, কথা বলছি। দেশের জনগণ ৫ তারিখের পর বুঝে গেছে একটি দল কতটা তাণ্ডব চালাতে পারে। তাই তারা দেশের শান্তি বজায় রাখার জন্য দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে উদগ্রীব হয়ে আছেন।’
এই আসনে অন্যান্য দলের প্রার্থী থাকলেও মূলত লড়াই হবে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আমির হামজার। দিন যত যাচ্ছে, লড়াইয়ের আভাস ততটাই শক্ত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কে জয়যুক্ত হবেন, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।